ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬ , ১০ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হজ ইসলামের অন্যতম রোকন ও ফরজ বিধান। প্রত্যেক সামর্থ্যবান মানুষের ওপর জীবনে একবার হজ করা ফরজ।

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট সময় : ২০২৬-০৪-২৩ ১৬:০৮:৩০
হজ ইসলামের অন্যতম রোকন ও ফরজ বিধান। প্রত্যেক সামর্থ্যবান মানুষের ওপর জীবনে একবার হজ করা ফরজ। হজ ইসলামের অন্যতম রোকন ও ফরজ বিধান। প্রত্যেক সামর্থ্যবান মানুষের ওপর জীবনে একবার হজ করা ফরজ।
লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক

(হে আল্লাহ, আমি আপনার ডাকে সাড়া দিয়েছি) 

গাজী মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জাবির।।

হজ ইসলামের অন্যতম রোকন ও ফরজ বিধান। প্রত্যেক সামর্থ্যবান মানুষের ওপর জীবনে একবার হজ করা ফরজ।


মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো হজ। হাদিসে হজের অসংখ্য সওয়াব ও ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। এই প্রবন্ধে চেষ্টা করব, ইনশাআল্লাহ। হজ কী, হজের কাজগুলো কী, কার ওপর ফরজ, হজের গুরুত্ব, ফজিলত এবং সামর্থ্যবানদের হজ না কর পরিণাম সম্পর্কে।

হজ কী: 
হজ আরবি শব্দ। এর শাব্দিক অর্থ হলো সংকল্প করা, সফর করা। পরিভাষায়- নির্ধারিত সময়ে নির্দিষ্ট কার্যাবলির মাধ্যমে বায়তুল্লাহ শরিফ জিয়ারত করাকে হজ বলা হয়।

হজের নির্দিষ্ট সময় :
আশহুরে হুরুম তথা শাওয়াল, জিলকদ ও
জিলহজের প্রথম ১০ দিন: বিশেষত জিলহজের ৮ থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত পাঁচ দিন। এ পাঁচ দিনই মূলত হজ পালন করা হয়। হজের নির্ধারিত স্থান হলো পবিত্র কাবা, সাফা-মারওয়া, মিনা, আরাফা ও মুজদালিফা। দূরবর্তী হাজিদের জন্য মদিনা মুনাওয়ারায় রাসুল (সা.)-এর রওজা জিয়ারত করা ওয়াজিব। (আসান ফিকাহ, খণ্ড: ০২, পৃষ্ঠা-২৫১)।

হজের কার্যাবলীর মধ্যে রয়েছে:
ইহরাম, তালবিয়া, তাওয়াফ ও সায়ি, অকুফে আরাফাহ, অকুফে মুজদালিফা, অকুফে মিনা, কংকর নিক্ষেপ, দম ও কোরবানি, হলক ও কছর এবং জিয়ারতে মদিনা-রওজাতুর রাসূল ইত্যাদি।

হজের বিধান: 
হজ আল্লাহর ফরজ বিধান। ইরশাদ হয়েছে, 'প্রত্যেক সামর্থ্যবান মানুষের ওপর আল্লাহর জন্য বায়তুল্লাহর হজ করা ফরজ' (সুরা আলে ইমরান: ৯৭)। রাসুল (সা.) বলেন, 'লোক সকল! আল্লাহ তায়ালা তোমাদের ওপর হজ ফরজ করেছেন।' আকরা ইবনে হাবিস (রা.) দাঁড়িয়ে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল। এটা কি প্রত্যেক বছর ফরজ?' উত্তরে রাসুল (সা.) বললেন 'আমি যদি হ্যাঁ বলতাম, তবে ফরজ হয়ে যেত। আর প্রতি বছর হজ ফরজ হলে তা তোমরা সম্পাদন করতে সক্ষম হতে না? হজ জীবনে একবারই ফরজ। কেউ যদি একাধিকবার করে, তবে তা হবে নফল হজ। (বুখারি: ৭২৮৮) । যাদের ওপর হজ ফরজ, যত দ্রুত সম্ভব হজ আদায় করা উত্তম। যেখানে মানুষের জীবন-মরণের এক সেকেন্ডের নিশ্চয়তা নেই, সেখানে এক বছর অনেক দীর্ঘ সময়। তাই রাসুল (সা.) বলেন, 'যে ব্যক্তি হজ করার ইচ্ছে করেছে, সে যেন তাড়াতাড়ি তা করে নেয়।' (সুনানে আবু দাউদ: ১৭৩২) । 

কার ওপর হজ ফরজ:
পাঁচটি শর্তসাপেক্ষে হজ ফরজ। ১) মুসলিম হওয়া ২) ২) আকল থাকা বা বিবেকবান হওয়া অর্থাৎ পাগল না হওয়া ৩) বালেগ বা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া ৪) আজাদ বা স্বাধীন হওয়া অর্থাৎ কারো গোলাম না হওয়া এবং ৫) দৈহিক ও আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান হওয়া। তবে মহিলাদের ক্ষেত্রে আরেকটি শর্ত যুক্ত হবে, সেটি হলো- সঙ্গে 'মাহরাম' (যেসব পুরুষের সঙ্গে দেখা সাক্ষাত জায়েজ) থাকা। 

হজের গুরুত্ব ও ফজিলত:
স্মরণ রাখতে হবে, জাকাত ফরজ না হয়েও কারো ওপর হজ ফরজ হতে পারে। কেননা হজ ও জাকাতের মধ্যে বিশেষ পার্থক্য রয়েছে। যেমন, জাকাতের সম্পর্ক নির্ধারিত নিসাবের সঙ্গে। হজের সম্পর্ক  মক্কায় আসা-যাওয়ার খরচের সঙ্গে। সুতরাং স্থাবর সম্পত্তির কিছু অংশ বিক্রি করে কেউ যদি হজ আদায় করতে সক্ষম হয় এবং হজ থেকে ফিরে এসে বাকি সম্পত্তি দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতে পারে, তাহলে তার ওপর হজ ফরজ। (ইমদাদুল আহকাম: ২/১৫২: আহসানুল ফতোয়া: ৪/৫১৬)।

একইভাবে ব্যবসায়ীর দোকানে যে পরিমাণ পণ্য আছে, তার কিছু অংশ বিক্রি করলে যদি হজ করা সম্ভব হয় এবং ফিরে এসে যদি বাকি পণ্য দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা যায়, তাহলে তার ওপরও হজ ফরজ। (ইমদাদুল আআহকাম: ২/১৫৩) । মুসলিম সমাজে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে, সেটি হলো- আগে মাতা-পিতার হজ করাবে, পরে নিজের কথা চিন্তা করবে। এটি সঠিক নয়, বরং সামর্থ্য থাকলে তাঁদের নিয়ে একসঙ্গে হজ করবে। অন্যথায় আগে নিজের ফরজ আদায় করবে।
(রহিমিয়া: ৮/২৮২) । আবার অনেকে মনে করেন, সন্তানের বিয়ে দেওয়ার পর হজ আদায় করতে হয়। অথচ এ কথা ইসলাম সমর্থিত নয়। ইসলামের দৃষ্টিতে সন্তানের বিয়ে জরুরি ঠিক আছে, তাই বলে সন্তানের বিয়ের জন্য হজে বিলম্ব করা যাবে না। (রহিমিয়া: ৮/২৭৬)। এক হাদিসে হজকে উত্তম আমল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একবার রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞেস করা হলো, 'সর্বোত্তম আমল কোনটি?' তিনি বললেন, 'আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনা।' প্রশ্ন করা হলো, 'তারপর কোনটি?' তিনি বললেন, 'আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা।' আবার প্রশ্ন করা হলো, 'এরপর কোনটি?' তিনি বললেন, 'হজে মাবরুর তথা মকবুল হজ।' (বুখারি: ১৫১৯)।  হাদিসে হজের মাধ্যমে গুনাহ মাফের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। রাসুল (সা.) বলেন, 'যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশে হজ করল এবং এসময় অশ্লীল ও গুনাহের কাজ থেকে বিরত থাকল, সে নবজাতক শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে ফিরে আসবে।' (বুখারি: ১৫২১)।

হজের বিনিময় জান্নাত:
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, এক উমরা আরেক উমরা পর্যন্ত মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহর ক্ষতিপূরণ হয়ে যায়। আর হজে মাবকরের প্রতিদান তো জান্নাত ছাড়া আর কিছুই নয়। (সহিহ বুখারি:: ১৭৭৩: সহিহ মুসলিম: ১৩৪৯; মুসনাদে আহমদ: ৭৩৫৪। সহিহ ইবনে হিববান। ৩৬৯৫)।
যেহেতু হজ আর্থিক ইবাদতের সাথে সম্পর্কিত। তাই অনেকে দরিদ্র হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় হজ পালন থেকে বিরত থাকে। অথচ হজ দারিদ্র বিমোচন করে। রাসুল (সা.) বলেন, 'তোমরা হজ-ওমরা সঙ্গে সঙ্গে করো। কেননা, এ দুটি দারিদ্র্য ও গোনাহ এভাবে দূর করে, যেভাবে হাঁপর লোহা ও সোনা-রুপার ময়লা দূর করে। আর মকবুল হজের বিনিময় জান্নাত' (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৮৮৭)। অন্য এক হাদিসে হজের জন্য খরচকৃত সম্পদকে সাতশো গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। বুরাইদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, 'হজের জন্য খরচ করা আল্লাহর রাস্তায় খরচ করার মতোই, যার সওয়াব সাত শ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।' (মুসনাদে আহমদ)।
হাদিসে সতর্ক করা হয়েছে। হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেন- 'যে ব্যক্তি হজ করার সামর্থ্য রাখে, তবুও হজ করে না, সে ইহুদি হয়ে মৃত্যুবরণ করল কি খ্রিস্টান হয়ে, তার কোনো পরোয়া আল্লাহর নেই।' (ইবনে কাসির: ১/৫৭৮)। আর কেউ যদি হজ অস্বীকার করে বা কোনো ধরনের অবহেলা প্রদর্শন করে তবে সে আল্লাহর জিম্মার বাইরে বলে বিবেচিত হবে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন- 'মানুষের মধ্যে যারা সেখানে (বায়তুল্লাহ) পৌঁছার সামর্থ্য রাখে তাদের ওপর আল্লাহর উদ্দেশ্যে এ গৃহের হজ করা ফরজ। আর কেউ যদি অস্বীকার করে, তাহলে জেনে রাখা উচিত যে, আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টিজগতের প্রতি মুখাপেক্ষী নন।' (সুরা আলে ইমরান: ৯৭)।  এছাড়াও হাদিসে কুদসিতে মহান আল্লাহ তায়ালা হজ না করার পরিণতি সম্পর্কে বলেন, 'যে বান্দাকে আমি দৈহিক সুস্থতা দিয়েছি এবং আর্থিক প্রাচুর্য দান করেছি, অতঃপর (গড়িমসি করে) তার পাঁচ বছর অতিবাহিত হয়ে যায় অথচ আমার দিকে (হজব্রত পালন করতে) আগমন করে না, সে অবশ্যই বঞ্চিত।' (ইবনে হিব্বান: ৩৭০৩)।

তালবিয়া ছাড়া কেবল নিয়তে কি ইহরাম শুদ্ধ হয়:
হজ ও ওমরা পালনের ইবাদত শুরু হয় 'ইহরাম' গ্রহণের মাধ্যমে। ইহরাম মূলত এমন এক আধ্যাত্বিক অঙ্গীকার, যার মাধ্যমে মুমিন ব্যক্তি। কিছু হালাল বিষয় নিজের ওপর নিষিদ্ধ করে মহান আল্লাহর দিকে সম্পূর্ণভাবে মনোনিবেশ করেন। সাধারণ হাজিদের মধ্যে একটি প্রচলিত ধারণা এছাড়াও হজ ও ওমরাহ পালনকারীকে আল্লাহর মেহমান বলা হয়েছে। আর এক্ষেত্রে মেহমানের সাথে আর আশানুরূপ আচরণ করা হবে। জাবির (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'হজ ও ওমরাকারীরা আল্লাহর প্রতিনিধি দল। তারা দোয়া করলে তাদের দোয়া কবুল করা হয় এবং তারা কিছু চাইলে তাদের তা দেওয়া হয়।' (মুসনাদে বাজজার: ১১৫৩)। ইহরামের কাপড় পরিধান, দুই রাকাত নামাজ আদায় এবং মনে মনে নিয়ত করলেই ইহরাম সম্পন্ন হয়ে যায়। কিন্তু শরিয়তের দালিলিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই ধারণাটি শরিয়তসম্মতভাবে সঠিক নয়। বরং ইহরাম সম্পন্ন হওয়ার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রয়েছে, যা অনেকেই উপেক্ষা করেন তা হলো তালবিয়া পাঠ। ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী, কেবল মনে মনে নিয়াত করার মাধ্যমে ইহরাম সম্পন্ন হয় না। নিয়ত আরবিতে হোক বা মাতৃভাষায়, সশব্দে হোক বা মনে মনে- এটি একা ইহরামের জন্য যথেষ্ট নয়। বরং নিয়তের পর মৌখিকভাবে 'তালবিয়া' (লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক) পাঠ করার মাধ্যমেই করতে হবে,করা উচিত।
ফকিহগণের মতে, ইহরাম মূলত দুটি অবিচ্ছেদ্য বিষয়ের সমন্বয়
১. হজ বা ওমরার সংকল্প (নিয়ত): যা অন্তরের কাজ।
২. তালবিয়া পাঠ করা। যা মৌখিক স্বীকৃতির কাজ। এই দুইয়ের সমন্বয় ছাড়া শরিয়তের পরিভাষায়া কোনো ব্যক্তি 'মুহরিম' হিসেবে গণ্য হন না। (সুত্রঃ জামে তিরমিজি: ১/১০২), গুনইয়াতুন নাসিক, পৃ. ৬৫: । মাসয়ালাগত সতর্কতা অনেকে মনে করেন, নিয়ত করলেই ইহরাম হয়ে গেছে, তাই তারা তালবিয়া পাঠে বিলম্ব করেন। মনে রাখা জরুরি-যদি কোনো ব্যক্তি ইহরামের কাপড় পরেন এবং নামাজও আদায় করেন, কিন্তু নিয়তের পর তালবিয়া পাঠ না করেন, তবে তিনি শরিয়তের সৃষ্টিতে 'মুহরিম' নন। যতক্ষণ না তিনি তালবিয়া পড়বেন, ততক্ষণ তিনি ইহরামের নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসবেন না এবং তার হজ বা ওমরা পালনের কার্যক্রমও শুরু হবে না। অতএব, হজ বা ওমরা পালনকারীদের জন্য জরুরি হলো শুধু ইহরামের পোশাক পরিধানেই সীমাবদ্ধ না থেকে মিকাত অতিক্রমের পূর্বেই নিয়তের সাথে যথাযথভাবে তালবিয়া পাঠ করা।

মাসজিদুল হারামে কোরআন তেলাওয়াত: 
মসজিদুল হারাম বা পবিত্র কাবা শরিফ পৃথিবীর সর্বাধিক মর্যাদাপূর্ণ স্থান। এই পুণ্যভূমিতে করা প্রতিটি নেক আমল আল্লাহর কাছে বিশেষ গুরুত্ব পায়। সাধারণ হাজিদের মনে একটি প্রশ্ন প্রায়ই জাগে- মসজিদুল হারামে কোরআন তেলাওয়াত করলে কি নামাজের মতো এক লক্ষ গুণ সওয়াব পাওয়া যায়? শরিয়তের দলিল ও বিজ্ঞ আলেমদের গবেষণায় এর উত্তর ও বিশেষ মাহাত্ম্য উঠে এসেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর স্পষ্ট হাদিস অনুযায়ী, মসজিদুল হারামে এক রাকাত নামাজের সওয়াব ১ লক্ষ গুণ বেশি (সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৪০৬)। তবে কোরআন তেলাওয়াত বা অন্যান্য নফল ইবাদতের ক্ষেত্রে ঠিক 'এক লক্ষ গুণ' সওয়াব কি না, তা নিয়ে দুটি মত রয়েছে।
মুহাদ্দিস ও ফকিহদের একাংশ মনে করেন, নামাজের সওয়াব যেহেতু নির্দিষ্টভাবে ১ লক্ষ গুণ বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে, তাই অন্যান্য ইবাদতের ক্ষেত্রেও আল্লাহর রহমতে এই আধ্যাত্মিক গুণিতক কার্যকর হতে পারে। তবে অধিকাংশ আলেমের মতে, অন্যান্য ইবাদতে সওয়াব বৃদ্ধির বিষয়টি নিশ্চিত হলেও তা নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যায় (যেমন ১ লক্ষ) নির্ধারিত নয়। বরং তা আল্লাহ তায়ালার বিশেষ মেহেরবানি ও ব্যক্তির আন্তরিকতার ওপর নির্ভর করে বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।

ওহি নাজিলের স্থানে তেলাওয়াতের স্বাদ: 
মসজিদুল হারামে কোরআন তেলাওয়াতের অনন্য একটি দিক হলো এটি 'মাহবাতে ওহি' বা ওহি নাজিল হওয়ার স্থান। যে পবিত্র ভূমিতে জিবরাইল (আ.) ওহি নিয়ে আসতেন, সেখানে বসে সেই ওহির কালাম তেলাওয়াত করার স্বাদই আলাদা। পবিত্র কাবা বা বায়তুল্লাহর সামনে বসে কোরআন তেলাওয়াত করার সময় এই পবিত্র পরিবেশের প্রভাবে ব্যক্তির ঈমানি হালত ও খুশু-খুজু (একাগ্রতা) বহুগুণ বেড়ে যায়। আধ্যাত্মিক এই পরিবেশ সরাসরি মুমিনের অন্তরে হেদায়াতের নূর ও প্রশান্তি ছড়িয়ে দেয়।

ফকিহদের বক্তব্য: 
ইসলামি আইনশাস্ত্রবিদ বা ফকিহগণ এ বিষয়ে একমত যে, সম্মানিত স্থান ও সময়ে ইবাদতের সওয়াব সাধারণ অবস্থার চেয়ে অনেক বেশি। বিখ্যাত ইমাম ও গবেষক ইমাম নববি (র.) এবং আল্লামা ইবনুল কাইয়িম (র.) এ বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, পবিত্র মক্কায় যেকোনো নেক আমলের মর্যাদা ও সওয়াব আল্লাহর বিশেষ করুণায় অন্য যেকোনো স্থানের চেয়ে শ্রেষ্ঠ।

হাজিদের জন্য কিছু প্রয়োজনীয় পরামর্শ : 
সময়ের মূল্যায়ন। হারামে অবস্থানকালীন প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান। তাই অপ্রয়োজনীয় আলাপ না করে তেলাওয়াত ও জিকিরে মগ্ন থাকা উচিত। ওহির ভূমিতে বসে কোরআনের মর্ম অনুধাবন ও চিন্তা করা উচিত।

আদব রক্ষা: 
কাবার সামনে তেলাওয়াত করার সময় পূর্ণ আদব, পবিত্রতা ও নিবিষ্ট মনোযোগ বজায় রাখা জরুরি। কারণ এখানে যেমন সওয়াব বেশি, তেমনি ইবাদতে অবহেলার গুনাহও বেশি। সুতরাং সর্বাত্মক সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

হজ ফরজ হওয়ার পর তাৎক্ষণিক আদায়ের গুরুত্ব :
 
হজ একবার ফরজ হলেও সামর্থ্য অর্জনের পর তা বিলম্ব করা শরিয়তের দৃষ্টিতে অনুচিত। কারণ সময়ের অনিশ্চয়তা, অসুস্থতা বা অন্য প্রতিবন্ধকতা যেকোনো সময়য় এসে যেতে পারে। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- 'যে ব্যক্তি হজ করার ইচ্ছা করে, সে যেন তাড়াতাড়ি তা আদায় করে নেয়। কারণ সে অসুস্থ হয়ে যেতে পারে বা বাহনের ব্যবস্থা নাও থাকতে পারে।' (মুসনাদে আহমদ: ১৮৩৩,সুনানে ইবনে মাজাহ)। 

সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও হজ না করার পরিণাম: 
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- 'মানুষের মধ্যে যারা সেখানে (বায়তুল্লাহ) পৌঁছার সামর্থ্য রাখে, তাদের ওপর আল্লাহর উদ্দেশ্যে এ গৃহের হজ করা ফরজ। আর কেউ যদি অস্বীকার করে, তবে জেনে রাখো আল্লাহ সৃষ্টিজগতের মুখাপেক্ষী নন।' (সুরা আলে ইমরান: ৯৭)।
সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও হজ না করার বিষয়ে হযরত ওমর (রা.) বলেন 'যে ব্যক্তি হজ করার সামর্থা রাখে, তবুও হজ করে না। সে ইহুদি বা খ্রিষ্টান হয়ে মৃত্যুবরণ করল কি না, আল্লাহ তার পরোয়া করেন না।' (তাফসির ইবনে কাসির: ১/৫৭৮)।

হতভাগ্য ও বঞ্চিত': 
হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'আমি আমার বান্দাকে সুস্থতা দিলাম, তার রিজিক প্রশস্ত করলাম, তবুও পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও সে আমার ঘরে আসেনি, সে হতভাগা ও বঞ্চিত।' (সহিহ ইবনে হিব্বান: ৩৬৯৫)। এই বর্ণনা হজের প্রতি অবহেলার ভয়াবহতা ও গুরুত্বকে আরও সুস্পষ্ট করে।
হজ আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য ও ভালোবাসার প্রকাশ।  আল্লাহর রাসূল সা: বলেছেন,, যার ওপর হজ ফরজ হয়েছে, তার উচিত বিলম্ব না করে দ্রুত তা আদায় করা। কারণ জীবন অনিশ্চিত, আর ফরজ হজ বাকি রেখে আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হওয়া এক চরম ক্ষতির বিষয় হতে পারে।

আল্লাহ তায়ালা মুসলিম উম্মাহর মাঝে সামর্থবানদের হজ আদায় করার তাওফিক দান করুন এবং  আর্থিকভাবে অক্ষম হজ প্রত্যাশীদের সক্ষমতা দান করুন, আমিন।।

নিউজটি আপডেট করেছেন : [email protected]

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ